অধ্যায় ৩৮: প্রকাশ্য কৌশল সফল হলো
হিমলার ছিল এক চরম তোষামোদকারি ব্যক্তি, সবাই তাকে অত্যন্ত ঘৃণা করত। তবে তার ক্ষমতা এত বেশি ছিল এবং野心 এত প্রবল যে, সাধারণত কেউ সরাসরি তার মুখোমুখি হতো না। হিটলার, যিনি একসময় মাধ্যমিক স্কুলও শেষ করতে না পারা এক অনাথ ছিলেন, আজ বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রের শাসক— তার প্রতিভা সন্দেহাতীত; বিশেষত মানুষের যোগ্যতা বিচার ও ব্যবহারে তিনি অতুলনীয় ছিলেন। এ সময় হিটলারের তোষামোদ শুনতে ভালো লাগছিল না, তিনি জয় চাচ্ছিলেন। বিরক্ত হয়ে তিনি হিমলারকে বললেন, "ঠিক আছে, হিমলার, তোমার আনুগত্য আমি জানি, কিন্তু তুমি তো জেনারেল নও, যুদ্ধের কিছু বোঝো না।"
হিমলার চুপসে গেল, অন্যেরা মনে মনে আনন্দ পেল। হিমলার সব সময় অজ্ঞ হয়ে বিশেষজ্ঞ সাজত, বোকা বুদ্ধি দিত, এবার ফিউরার তাকে ধমকালেন, তাই তার প্রাপ্যই হলো। এ সময় গ্যোরিং বলল, ‘‘ফিউরার, সোভিয়েত সেনারা সম্প্রতি হঠাৎ শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, তবে তারা আমাদের সেনাবাহিনীর তুলনায় এখনো দুর্বল। আমার মনে হয়, শীতের আগেই আমরা স্তালিনগ্রাদ দখল করতে পারব, তবে শর্ত হচ্ছে, সম্মুখসারিতে প্রচুর অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। যদি এখনই প্রচুর শীতবস্ত্র ইত্যাদি পাঠাতে হয়, তাহলে আমাদের রসদ সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর ভীষণ চাপ পড়বে, তা সহ্য করা হবে কষ্টকর।’’
ইওডেল দেখল, গ্যোরিং আবারও অযথা উপদেশ দিচ্ছে, সে তাড়াতাড়ি বলল, ‘‘ফিউরার, যদিও আমরা এখনও আক্রমণাত্মক অবস্থায় আছি, তবু সম্মুখসারিতে আমাদের খুব বেশি সুবিধা নেই। গলিপথের যুদ্ধ আমাদের শক্তিকে কাজে লাগাতে দেয় না; সমতলে যুদ্ধ হলে আমি অবশ্যই আগে অস্ত্র ও খাদ্য পাঠানোর পক্ষ নিতাম, কারণ আমি বিশ্বাস করি, আমাদের বীর সৈন্যরা দুই মাসের মধ্যে সোভিয়েতদের পরাজিত করতে পারবে। কিন্তু গলিপথের যুদ্ধে আমাদের সুবিধা নেই, আমাদের সৈন্যরা শহরে ক্লান্তিতে মরছে, অথচ স্লাভদের জনসংখ্যা একশ মিলিয়নের বেশি, আমাদের আর্য জাতির সংখ্যা তাদের অর্ধেকের সামান্য ওপর। দীর্ঘমেয়াদে এত জনবল ক্ষয় আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়, আমরা চীন নই, যেখানে পাঁচ শ' কোটি মানুষ আছে।’’
‘‘এখনও আমাদের পশ্চিম সীমান্তে প্রচুর সৈন্য রেখে প্রতিরক্ষা করতে হচ্ছে, ব্রিটিশ ও আমেরিকানরা যেকোনো সময় আক্রমণ করতে পারে। সৈন্য শেষ হয়ে গেলে আমাদের জয় টিকিয়ে রাখবে কে? তাই ফিউরার, চূড়ান্ত জয় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের জীবনীশক্তি সংরক্ষণ করা উচিত। স্তালিনগ্রাদ এ বছর না হলে পরের বছর নেওয়া যাবে, সৈন্য থাকলেই হবে; সৈন্য ছাড়া শহর নিলেও পরে সোভিয়েতদের পাল্টা আক্রমণ ঠেকাবে কে?’’ ইওডেল উৎসাহিত হয়ে আরও বলল, সে ছিল একনিষ্ঠ নাৎসি ও জাতীয়তাবাদী, সে যুক্তি দিয়ে দেশের দীর্ঘমেয়াদী কল্যাণ চেয়েছিল, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো শুধু জমি হারানো আর ক্ষতিপূরণ ছাড়া যেন কিছুই না হয়।
হিটলার কিছুটা চিন্তিত হলেন, ইওডেল তার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সেনাপতিদের একজন, তার কথার যথেষ্ট ওজন ছিল। হিটলার তার আরেক বিশ্বস্ত সেনাপতি কাইটেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘‘কাইটেল, তোমার কী মত?’’
জার্মান প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান কাইটেল সেনাপতিদের মধ্যে ‘‘অনুগত কুকুর’’ নামে কুখ্যাত ছিল, কারণ সে হিটলারের প্রতি অতিরিক্ত অনুগত ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরও কাইটেল সেনাবাহিনীতে ছিল। ১৯৩১ সালে সে কর্নেল, ১৯৩৩ সালে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হয়ে ব্রেমেনে ২২তম ডিভিশন গঠন করেছিল।
১৯৩৫ সালে ডিভিশন কমান্ডার থেকে সরাসরি সামরিক দপ্তরের প্রধান, ১৯৩৮ সালে প্রতিরক্ষা বাহিনীর চিফ অফ স্টাফ হয়ে হিটলারের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সামরিক উপদেষ্টা হয়ে ওঠে। কিন্তু বড় সিদ্ধান্তে সে কখনো হিটলারকে টলাতে পারেনি, যেমন পোল্যান্ড আক্রমণের আগে সে আপত্তি তুলেছিল।
পরে কাইটেল জেনারেল হন। সেনাবাহিনীর বিদ্রোহী প্রবণতার সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ ছিল না। তিনি মনে করতেন, হিটলারের সামরিক বিচক্ষণতা প্রশ্নাতীত। যদিও হিটলারের সিদ্ধান্ত অনেক সময় তার ব্যক্তিগত মতের সম্পূর্ণ বিপরীত হতো, তবুও তিনি সর্বদা অবাধ্যতা পরিহার করতেন।
পশ্চিম ফ্রন্টে বিজয়ের পর, ব্রিটিশ ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল অকপটে স্বীকার করেছিলেন, ‘‘জার্মানরা পরিকল্পনা, নেতৃত্ব ও দৃঢ়তায় স্পষ্টতই এগিয়ে ছিল। তারা নির্দ্বিধায় তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে এবং বিমান বাহিনীকে সর্বোচ্চভাবে ব্যবহার করতে জানত।’’
এটি ছিল কাইটেলের সামরিক প্রতিভার স্বীকৃতি। কিন্তু তার সামরিক প্রজ্ঞা সব সময় ইতিবাচক ছিল না; যেমন, পশ্চিম ফ্রন্টে মিত্রবাহিনীর বড় পরাজয়ের সময়, তিনি ও ইওডেল মিলে হিটলারের এমন এক অদ্ভুত নির্দেশ সমর্থন করেছিলেন, যার ফলে ব্রিটিশ বাহিনী ও তাদের সঙ্গে ঘেরা ফরাসি বাহিনী রক্ষা পায়—যা পরে অনেক সেনাপতি ও সামরিক ইতিহাসবিদের সমালোচনার কারণ হয়।
পশ্চিম ফ্রন্টে বিজয়ের পর, ১৯৪০ সালের জুলাইয়ে কাইটেল ফিল্ড মার্শাল হন। অনেক জার্মান সেনাপতি এতে অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। যেমন, মনস্টাইন তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘‘এভাবে পদমর্যাদা কমে যায়। পোল্যান্ড যুদ্ধ শেষে সেনাবাহিনীর প্রধান ও দুটি গ্রুপ কমান্ডার এই পদ পাওয়ার যোগ্য ছিলেন, কিন্তু হিটলার তাদের পদোন্নতি দেননি। পরে হঠাৎ এক ডজন ফিল্ড মার্শাল বানালেন, যেখানে শুধু কয়েকজন দক্ষ কমান্ডারই ছিলেন, বাকিরা ছিল দাপ্তরিক কর্তা, যারা কখনো সেনাবাহিনি প্রধান বা অপারেশনস চিফ ছিলেন না…তাদের দক্ষতা সেনাপতিদের সমান নয়।’’
পূর্ব ফ্রন্ট আক্রমণের সিদ্ধান্তে কাইটেল আপত্তি জানিয়েছিলেন এবং সোভিয়েত আক্রমণ না করার সুপারিশপত্র দিয়েছিলেন। হিটলার তা একেবারেই গুরুত্ব দেননি। তখন থেকেই কাইটেল হিটলারকে আরও বেশি তোষামোদ করতে শুরু করেন। ১৯৪১ সালের ২৫ জুলাই, নৌপ্রধান রেডার দ্রুত বিজয়ের জন্য ইংল্যান্ডকে প্রধান শত্রু ধরে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় অভিযান বাড়ানোর পরামর্শ দেন। কাইটেল জানতেন, হিটলারের মন শুধু সোভিয়েত আক্রমণে, তাই তার বিরাগ এড়াতে কাইটেল পুরো সুপারিশপত্র বদলে দেওয়ার প্রস্তাব দেন।
পূর্ব ফ্রন্টের যুদ্ধে, কাইটেলের নেতৃত্বে জার্মান হেডকোয়ার্টার অনেক সময় সাময়িক কৌশলগত সাফল্যকেই সর্বজনীন সমাধান ধরে নিয়েছিল। হিটলারের ‘‘অগ্রসর হও, পিছু হটো না’’ নীতিকে কৌশলগত নমনীয়তার জায়গায় বসিয়ে দেওয়া হয়, সেনাবাহিনীর প্রাণবন্ত ও সৃজনশীল মনোভাবের বদলে যান্ত্রিক শৃঙ্খল প্রতিষ্ঠিত হয়। সেনাবাহিনীর পিছু হটা যে কখনও কখনও কৌশলগতভাবে জরুরি, তা পুরোপুরি উপেক্ষিত হয়। কাইটেলের কৌশল ক্রমশ হিটলারের কল্পিত অদ্বিতীয়তায় রূপ নেয়। তিনি ফিউরারের অন্তর্দৃষ্টি অন্ধভাবে বিশ্বাস করেন, মনে করেন হিটলার ‘‘ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সেনাপতি’’—এটা সাধারণ তোষামোদের চেয়েও অনেক বেশি ছিল, তিনি হিটলারের মোহে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধে, ষষ্ঠ সেনাদল ঘেরাও হওয়ার পরে হেডকোয়ার্টার জানত উদ্ধার অসম্ভব, তবুও হিটলারের আদেশে পিছু হটার অনুমতি দেয়নি, বরং কঠোরভাবে প্রতিরোধের নির্দেশ দেয়। ফলে ছয়টি পদাতিক, তিনটি মোটরাইজড, তিনটি ট্যাঙ্ক, একটি আকাশ প্রতিরক্ষা ও রোমানিয়ান ও ক্রোয়েশীয় বাহিনীর একাধিক ইউনিট ধ্বংস হয়, প্রায় ছাব্বিশ হাজার পাঁচশো সৈন্য নিঃশেষ হয়। এই অচল নির্দেশনার জন্য জার্মান হেডকোয়ার্টার দায়ী, কিন্তু প্রচারযন্ত্র তখন এটিকে অনিবার্য ও যুক্তিসঙ্গত ভুল বলে চালিয়ে দিয়েছিল, যা সত্য জানা সেনাপতিদের কাছে কাইটেলকে ঘৃণার পাত্র করে তোলে।
পূর্ব ফ্রন্টে কাইটেল বিনা দ্বিধায় হিটলারের নির্দেশে মহান সেনাপতিদের বরখাস্ত করতেন, এমনকি মৃত্যুদণ্ডে সমর্থন দিতেন, যদিও তাদের অপরাধ ছিল কেবলমাত্র ‘‘মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিরোধ’’ নির্দেশ না মানা।
অবশ্য, এসমস্ত তখনও ঘটেনি, ইতিহাস অপরিবর্তিত থাকলে এগুলো সামনে ঘটবে।
কাইটেল হিটলারের মন বুঝে চলত, জানত কখন তোষামোদ আর কখন গঠনমূলক মতামত দিতে হয়, হিমলারের বিপর্যয়ের পর সে বুঝে গেল হিটলার কী চায়।
কাইটেল বলল, ‘‘আমার ফিউরার, ইওডেলের কথা যথার্থ। আমাদের সৈন্য যেখানে দাঁড়িয়ে থাকে, সেখানেই আমাদের ভূমি। সৈন্যদের শীতে কষ্ট দেওয়া আমাদের উচিত নয়, তাই যত দ্রুত সম্ভব শীতকালীন সরঞ্জাম পাঠানো দরকার। ছয় মিলিয়ন লোকের প্রয়োজন তাৎক্ষণিকভাবে পূরণ সম্ভব নয়, এখন থেকেই শুরু করাই ভালো। গরমে ধাতু প্রসারিত ও শীতে সংকুচিত হয়, এতে চীনা বাহিনীর মতো অস্ত্রগত সমস্যাও হতে পারে, তাই আগে থেকেই ঠাণ্ডার তেল ইত্যাদি সরবরাহ করা উচিত।’’
হিটলার দেখলেন, তার দুই প্রিয় সেনাপতিই একই মত দিচ্ছেন এবং যুক্তিযুক্ত কথা বলছেন। তিনি হিমলারের দিকে ফিরে বললেন, ‘‘হিমলার, আমাদের শীতকালীন সরঞ্জামের প্রস্তুতি কেমন হলো?’’
হিমলার কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কারণ জার্মানির কোনো প্রস্তুতি ছিল না—তারা ভেবেছিল শীত আসার আগেই যুদ্ধ শেষ হবে, তাই শীতের সরঞ্জামের জন্য কোনো পরিকল্পনা ছিল না। লাখ খানেক লোকের জন্য হয়তো দখলকৃত অঞ্চল থেকে কিছু যোগাড় করা যেত, কিন্তু ছয় মিলিয়ন সৈন্যের জন্য কিছুই করা সম্ভব নয়। সে ঠিক করল সত্য বলবে।
হিমলার আতঙ্কিত মুখে বলল, ‘‘ফিউরার, আমরা সব সময় ভেবেছিলাম শীতের আগেই যুদ্ধ শেষ হবে, তাই কোনো প্রস্তুতি নেই।’’
হিটলার শুনে মুখ অন্ধকার করে ফেললেন। তিনি সবাইকে বাইরে যেতে বললেন, শুধু হিমলার থেকে গেল। যখন কেবল হিমলার রইল, হিটলার হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন, ‘‘আমি ফিউরার, আমি ফিউরার! এ রকম ছোট ব্যাপারও কি আমাকে দেখতে হবে? সম্মুখসারির সৈন্যদের যদি টয়লেট পেপার না থাকে, তাও কি আমাকে মনে করিয়ে দিতে হবে? যেমন করেই হোক, ফ্রন্টলাইনে শীতকালীন সরঞ্জাম পাঠাতে হবে, নইলে...’’
বাইরে সবাই মনে মনে হাসল, কিন্তু হিমলারের মুখ ছিল শুকনো, বিষণ্ন। রাজাকে সন্তুষ্ট করা মানে বাঘের সঙ্গে পথ চলা—এক ভুলেই সর্বনাশ!